দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির নেতৃত্বে থাকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ খাগড়াছড়ি জেলা জামায়াত। জেলা শাখার আমির সৈয়দ মো. আবদুল মোমেন ১৯৯৮ সাল থেকে টানা প্রায় ২৮ বছর ধরে এ পদে রয়েছেন। কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির হিসেবে কাজী দ্বীন মোহাম্মদও ২৮ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে ১৪ অক্টোবর মহানগর কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের ব্যক্তিগত গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। ঘটনার পর ১৬ অক্টোবর কাজী দ্বীন মোহাম্মদকে আমির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং মহানগর কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। দলের কেউ কেউ এই ঘটনাকে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
জামায়াতের দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরে রুহুল আমীন ভূঁইয়া ২৩ বছর, ঝালকাঠিতে হাফিজুর রহমান ২২ বছর এবং জয়পুরহাটে ফজলুর রহমান সাঈদ ২০ বছর ধরে জেলা আমিরের দায়িত্বে রয়েছেন। রাজবাড়ীর আমির নুরুল ইসলাম ২০০৯ সালে দায়িত্ব পান। খুলনা জেলার এমরান হুসাইন ১৮ বছর এবং বরিশালের আবদুল জব্বার ১৭ বছর ধরে একই পদে আছেন। বান্দরবানের এস এম আবদুস সালাম আজাদ ও রাঙামাটির আবদুল আলিম ১৬ বছর ধরে জেলা আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন। সিরাজগঞ্জে শাহীনুর আলম ১৪ বছর এবং গাজীপুরে জাহাঙ্গীর আলম ১৩ বছর ধরে এ পদে রয়েছেন। বগুড়া জেলা ও মহানগর এবং ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগরেও একই ব্যক্তিরা ১১ বছর ধরে আমিরের দায়িত্বে আছেন। টাঙ্গাইল, মেহেরপুর ও পাবনায় বর্তমান আমিরদের দায়িত্বকাল ১০ বছর চলছে।
কুড়িগ্রামের মো. আজিজুর রহমানের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় নেতৃত্বে থাকার নজির রয়েছে। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর জেলা আমির ছিলেন। ভূরুঙ্গামারী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কলেজটি সরকারীকরণের বিষয় সামনে এলে তিনি আমিরের পদ ছেড়ে দেন। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আবার জেলা আমিরের দায়িত্ব পান। অর্থাৎ, কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন নেতৃত্বে থাকার পর বিরতি দিয়ে একই ব্যক্তির আবার শীর্ষ পদে ফিরে আসার ঘটনাও রয়েছে।
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটি ও কেন্দ্রীয় আমিরের মেয়াদ তিন বছর এবং জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ দুই বছর। উভয় ক্ষেত্রেই রুকনদের গোপন ভোটে আমির নির্বাচিত হন। দলটি এ পদ্ধতিকে গণতান্ত্রিক বলে বর্ণনা করে। তবে ভোটারের সংখ্যা, প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয় না। ফলে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে একই ব্যক্তি কীভাবে বারবার নির্বাচিত হচ্ছেন, নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রতিযোগিতা কতটা কার্যকর এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ কতটা রয়েছে—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন।
দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির শীর্ষ পদে থাকার পেছনে দলীয় কাঠামো ও দায়িত্ব পালনের ধরনও আলোচনায় এসেছে। জামায়াতের দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের কিছু নেতা সার্বক্ষণিকভাবে দলকে সময় দেন। তাঁদের খরচ দল বহন করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে গাড়িসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়। দলের ভেতরে তাঁরা ‘ফুল টাইমার’ হিসেবে পরিচিত। তাঁদের কারও কারও জন্য দলীয় অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে কাজের সুযোগও থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন নেতা প্রথম আলোকে বলেছেন, ফুল টাইমারদের মধ্যে কারও কারও পদ ধরে রাখার প্রবণতা রয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে জেলা ও মহানগর আমিরদের অগ্রাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনাও শীর্ষ পদ ধরে রাখার আগ্রহ বাড়াতে পারে। তাঁদের মতে, এর ফলে নতুনদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নন। তাঁদের বক্তব্য, আমির নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে যোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও ইসলামি আন্দোলনের প্রতি একনিষ্ঠতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দলের বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক মুয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেছেন, রুকনেরা পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে আমির নির্বাচন করেন এবং দল প্রয়োজন মনে করলে কাউকে পদ থেকে সরিয়েও দেয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহানের বক্তব্য, জেলা আমিররা যাঁদের নেতা হিসেবে তৈরি করেন, তাঁদের হাতেই পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব যায়। তাই নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না—এমন বক্তব্য তিনি সঠিক বলে মনে করেন না।
জামায়াতের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে কুমিল্লার ঘটনার পর। দলের ভেতরে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার কাজ যথেষ্ট হচ্ছে কি না। কুমিল্লার ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। এর আগে জামায়াতের এক সাবেক প্রচার সম্পাদক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অধস্তন পর্যায়ের অসন্তোষ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা লিখেছিলেন।
প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর জামায়াতের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব ও পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বর্তমান সংসদে ৭৬টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানে রয়েছে দলটি, যা সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটির রাজনৈতিক তৎপরতা ও প্রভাব বেড়েছে এবং নতুন নেতা-সমর্থকেরাও যুক্ত হয়েছেন। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামানের জামায়াতে যোগ দেওয়ার ঘটনাও দলটির সম্প্রসারণের উদাহরণ হিসেবে এসেছে। দলের নেতাদের একাংশ মনে করছেন, প্রভাব ও সাংগঠনিক বিস্তারের সঙ্গে পদ-পদবি ঘিরে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ার প্রবণতাও প্রকাশ পেয়েছে। ১২ অক্টোবর চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জামায়াতের যুব বিভাগের ইউনিয়ন শাখার সভাপতি আহাদ আলী দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। দল অন্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার পর তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলীয় ও জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নরসিংদী-২ আসনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম সারোয়ার ওরফে সারোয়ার তুষারকে প্রার্থী করলেও জামায়াত নেতা আমজাদ হোসাইন নির্বাচনে অংশ নেন। চট্টগ্রাম-৮ আসনে জোটের প্রার্থী এনসিপির জুবাইরুল হাসানের পক্ষে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও জামায়াতের আবু নাছের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি এবং নির্বাচন থেকেও সরে দাঁড়াননি।
জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের সঙ্গে তরুণদের নেতৃত্বে আসার সুযোগের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর ছাত্র সংসদ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির বলেছিলেন, তরুণেরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবে এবং তাঁরা পেছন থেকে শক্তি জোগাবেন। তবে ছাত্রশিবিরের সাবেক কয়েকজন নেতা মনে করেন, জেলা পর্যায়ে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির পদে থাকার প্রবণতা তরুণদের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ সীমিত করতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতের নেতারা বলছেন, অভিজ্ঞ নেতাদের হাত ধরেই নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে এবং দলীয় নিয়ম অনুযায়ী ভোটের মাধ্যমেই নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়।
সব মিলিয়ে, জামায়াতের বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির আমির পদে থাকা, ফুল টাইমারদের ভূমিকা, দলীয় মনোনয়নে পদধারীদের অগ্রাধিকার এবং সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ বিরোধ—এসব বিষয় নেতৃত্বের নবায়ন নিয়ে আলোচনাকে সামনে এনেছে। গঠনতন্ত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদ ও ভোটের বিধান থাকলেও একই ব্যক্তির দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকার কারণ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সীমিত। কুমিল্লার ঘটনার পর দল কীভাবে নেতৃত্ব নির্বাচন, সাংগঠনিক অসন্তোষ মোকাবিলা এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির বিষয়গুলো বিবেচনা করে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
