জাগ্রত শ্রাবণজাগ্রত শ্রাবণ

অর্থাভাবে বন্ধের পথে এসএসসিতে জিপিএ–৫ পাওয়া রুকসানার পড়াশোনা

এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে রাজশাহী সিটি কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে পুঠিয়ার সিংড়া গ্রামের মোছা. রুকসানা খাতুন। ভালো ফলের পর তার চোখে ছিল উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের হাল ধরার প্রত্যাশা। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের এই শিক্ষার্থীর সেই স্বপ্ন এখন অর্থসংকটে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কলেজের বই কেনা, রাজশাহী শহরে থাকার জায়গা ঠিক করা এবং থাকা-খাওয়ার খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই পরিবারের। এর মধ্যে আড়াই বছর ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত মা রাফিয়া বিবির শারীরিক অবস্থারও অবনতি হয়েছে। অর্থের অভাবে তাঁর উন্নত চিকিৎসাও করানো যাচ্ছে না।

লিখেছেন
· পড়তে সময় লাগবে ২ মিনিট
অর্থাভাবে বন্ধের পথে এসএসসিতে জিপিএ–৫ পাওয়া রুকসানার পড়াশোনা
বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে মোছা. রুকসানা খাতুন। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার সিংড়া গ্রামে · (ছবি সংগৃহীত)

রুকসানা পুঠিয়া উপজেলার সিংড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা মো. নূর মোহাম্মদ পেশায় দিনমজুর। পাশের এলাকার ধোপাপাড়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে সে। এরপর রাজশাহী সিটি কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়। কিন্তু ভর্তি হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতেই পরিবারকে হিমশিম খেতে হয়।

রুকসানার পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা জানতে পেরে পুঠিয়া উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবুদাস সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁর সহায়তায় রাজশাহী সিটি কলেজে ভর্তি হতে পেরেছে রুকসানা। তবে ওই কর্মকর্তা বদলি হয়ে যাওয়ার পর কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা কীভাবে পাবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে পরিবারটি।

কলেজে ভর্তি হওয়াই রুকসানার সামনে এখন একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। বাড়ি থেকে প্রতিদিন রাজশাহী শহরে যাতায়াত করা সম্ভব নয় বলে শহরে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বই-খাতা, খাবার ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর খরচও রয়েছে। কিন্তু দিনমজুর বাবার সীমিত আয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোই কঠিন। ফলে কীভাবে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন নূর মোহাম্মদ।

বিজ্ঞাপন

এরই মধ্যে পরিবারের সংকট আরও বেড়েছে রুকসানার মায়ের অসুস্থতায়। আড়াই বছর ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন রাফিয়া বিবি। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ১৮ অক্টোবর তাঁকে পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে দুই দিন চিকিৎসার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু অর্থের অভাবে তাঁকে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার টাকাও জোগাড় করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত রাফিয়া বিবিকে বাড়িতে নিয়ে আসতে বাধ্য হন তাঁর স্বামী নূর মোহাম্মদ। একদিকে স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার খরচ—দুই সংকটের মধ্যে পড়ে দিশাহারা এই দিনমজুর। পরিবারের সামর্থ্য না থাকায় মায়ের চিকিৎসা ও মেয়ের শিক্ষাজীবন—দুটিই এখন বাধার মুখে।

রুকসানা জানায়, তার তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁদের নিজেদের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। তাই বোনদের পক্ষেও পরিবারকে নিয়মিত সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা হারায়নি সে।

রুকসানা সাংবাদিকদের বলে, ‘আমার তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁদেরও আর্থিক অবস্থা ভালো না। কোনো সহায়তা করতে পারেন না। কিন্তু যেভাবেই হোক আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই।’

রুকসানার এই প্রত্যাশার বিপরীতে বাস্তবতা কঠিন। এসএসসিতে ভালো ফল করার পর উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে সহায়তা প্রয়োজন, তা তার পরিবারের পক্ষে একা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে মায়ের চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পারায় পরিবারটি আরও সংকটে পড়েছে।

ধোপাপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, রুকসানার পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। তাদের বসবাসের ঘরও ভালো নয়। বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার কাছ থেকে বেতন নেওয়া হয়নি। এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময়ও তাকে সহযোগিতা করা হয়েছিল।

প্রধান শিক্ষক মনে করেন, বিত্তবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে রুকসানা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে এবং ভবিষ্যতে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

জিপিএ-৫ অর্জনের পরও অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়া রুকসানার সামনে এখন প্রয়োজন নিয়মিত শিক্ষাসহায়তা ও পরিবারের চিকিৎসাসংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা। উপযুক্ত সহায়তা পেলে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা সম্ভব হতে পারে।

বিজ্ঞাপন